শবে কদর ভাগ্য উন্নয়নের রজনী

আজগর সালেহীঃ মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ট রজনী লাইলাতুল কদর অত্যন্ত সংকটাপন্ন। পঞ্চাশ ষাট বছরের হায়াতের অধিকারী আল্লাহপাকের সর্বশ্রেষ্ট সৃষ্টি বনি আদমের জন্য লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও মহত্বের কোন সীমা নেই। অফুরন্ত ফযীলতের অধিকারী লাইলাতুল কদর পাওয়া প্রত্যেক মানুষের জন্য অবশ্যই ভাগ্যের ব্যপার। লাইলাতুল কদরের যথাযত মূল্যায়নের মাধ্যম একজন পাপিষ্ট ব্যক্তি পূন্নবান হতে পারে। হয়ে যেতে পারে সর্বোৎকৃষ্ট একজন মহান চরিত্রের অধিকারী। ধুয়ে মুছে ধবধবে সাদা জীবন গড়ে তুলতে পারে লাইলাতুল কদর প্রাপ্ত একজন গুনাহগার ব্যক্তি। জীবনের প্রতিটি ণ যে লোকটি পরিহার্য ও গর্হিত কাজে নিমজ্জিত ছিল সেই লোকটিও হতে পারে প্রস্পুটিত গোলাপের ন্যায় নিষ্পাপ ও গৌরবময় জীবনের অধিকারী। শবে কদর অমূল্য রজনী এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। মহাত্বপূর্ণ এই রজনী পাওয়ার পরও যে লোকটি ফিরিয়ে আসতে পারল না অন্ধকার থেকে আলোর জগতে সে বড়ই হতভাগা ও পুড়া কপালের। একজন মানুষের জীবনে যথাযত শবে কদর একবারই যতেষ্ট। শুধু প্রয়োজন একটু শ্রম ও পাওয়ার অধির আগ্রহ। ধরতে পারলেই লাকী কপাল। সারাবছরের ন্যায় নাক ঢেকে ঘুমালে হবে না। সচেতন হতে হবে। আগ্রহ নিয়ে চাইতে হবে মওলার দরবারে।

লাইলাতুল কদর পরিচয় :-
লাইলাতুন শব্দটি আরবী। অর্থ হচ্ছে রাত। আর কদর শব্দের অর্থ হচ্ছে, মহাসম্মান, নির্ধারিত ভাগ্য ও ভাগ্যোন্নয়ন। বুঝা গেল লাইলাতুল কদর একটি মহামান্বিত ও ভাগ্যোন্নয়নের রাত। এই রাতেই মানুষ সম্মানের অধিকারী হয়। হয় মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। আল্লাহপাকের নিকট এই রাতের সম্মান ও মর্যাদা খুব বেশী। হযরত আবু বকর ওয়াররাক রহ. বলেন, এরাতটিকে কদরের রাত এ কারণে বলা হয়। কেননা এরাতে যে সমস্ত মানুষের গুনাহ খাতা ও বেআমলির কারণে কোন মান-মর্যাদা ছিল না দারা ও তাওবা- এস্তেগফার ও ইবাদত- বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহ পাকের নিকট সম্মানিত ও মর্যাদাবান হয়ে যায়। কদরের আরেক অর্থ হল ভাগ্য বা তাকদীর। এ অর্থ হিসাবে এ রাতকে এজন্য কদরের রাত বলা হয়। কেননা ও রাতে একটা মানুষের পূর্ণ জীবনের জন্য আল্লাহ পাক যা কিছু নির্ধারণ করে রেখেছেন তার মধ্য হতে আগামী এক বৎসরের বিষয়াদি ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করেন। অর্থাৎ আগামী এক বছরে একজন মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটবে তার একটি তালিকা লওহে মাহফুয থেকে নকল করে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। মানুষের ভাগ্যলিপিতো আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টি বহু পূর্বেই লিখে রেখেছেন।

শবে কদর কী?
রমাযান মাসের রাত সমূহ থেকে একটি রাতকে শবে কদর বলা হয়। যা অনেক মর্যাদাপূর্ন ও বরকত ওয়ালা। কুরআন শরীফে এরাতটিকে হাজার মাস অপোয় উত্তম বলা হয়েছে। সূরায়ে কদরে إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ আল্লাহপাক বলেন, আমি ইহা নাজিল করেছি এক সম্মানিত রাতে। সূরা দূখানের ৩নং আয়াতে বলেন, নিশ্চয় আমি ইহা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। সূরায়ে কদরের ৩ থেকে ৫ নং আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন, لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ * تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ * سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ কদরের রাতটি হাজার মাস থেকে উত্তম। এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাঈল তাদের প্রভূর অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হয়। রাতটি (সন্ধ্যা হতে) সুবহে সাদেক পর্যন্ত শান্তি বর্ষিত হতে থাকে। হযরত আনাস (রাদিঃ) বলেন, রমাযান মাস এলে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করতেন, তোমাদের নিকট রমাযান মাস উপস্থিত হয়েছে এর মধ্যে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে ব্যক্তি সে রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল সে সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রইল। সে রাতের কল্যাণ থেকে ভাগ্যহীন লোকেরাই বঞ্চিত থাকে। যে ব্যক্তি এরাতে ইবাদত-বন্দেগী করে সে যেন, আটশত চৌত্রিশ বছর চার মাসের অধিক সময় লাগাতার ইবাদত- বন্দেগীর মধ্যে কাটিয়ে দিল। বরং তার চেয়েও অধিক সময় আর অধিক সময়ের কোনো হিসাব বান্দার কাছে নেই। একমাত্র আল্লাহপাক ই এব্যাপারে ভালো জানেন। কারণ ঐ জামানায় গণনার সর্বশেষ সংখ্যা ছিল হাজার।

লাইলাতুল কদর কখন?
২৭ রমাযান লাইলাতুল কদর প্রসিদ্ধ হলেও রাসুল করিম (সাঃ) থেকে বিভিন্ন বর্ণনা মতে ২১ রমাযান থেকে পরবর্তী প্রত্যেক বিজোড় রাতের মধ্যে যে কোন এক রাতে হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাসুলে করিম (সাঃ) ইরশাদ করেন, শবে কদরকে আল্লাহপাক বিশেষভাবে আমার উম্মতকেই দান করেছেন, পূর্বের কোন ইম্মতকে এ নেয়ামত দান করা হয় নাই। রাসুলে খোদা (সাঃ) বলেন, পূর্বের জামানার উম্মতদের হায়াত বেশী ছিল। তারা বেশী ইবাদত- বন্দেগী করার সূযোগ পেয়েছে। কিন্তু আমার উম্মতের হায়াতের পরিমাণ অনেক কম। তাই তারা যদি নেক আমলের েেত্র তাদের বরাবর হতে চায়, তাহলে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। তখন রাসুল্লাহ (সাঃ) এর মনটা কেমন যেন একটু ছোট হয়ে গেলো, তখন আল্লাহ পাক তাঁর পেয়ারা হাবীব কে খুশি করার জন্য তাঁকে এবং তাঁর উম্মতকে এই মহামূল্যবান রাতটি দানে করেন।

অধিক কামাইয়ের রজনী শবে কদর:-
এরাতের ফযিলতের জন্য যদিও কুরআন শরীফে পূর্ণ একটি সূরাই যথেষ্ট তার পরও নমুনা সরূপ দুইটি হাদীস পাঠকদের উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হচ্ছে।

হযরত আবু হুরাইরা (রাদিঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুল করিম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় শবে কদরে আল্লাহপাকের ইবাদত বন্দেগী করে কাটাবে, আল্লাহপাক তার পিছনের সমস্ত গুনাহ-খাতা মা করে দিবেন (বোখারী-মুসলিম)।

দুনিয়ার কোন ব্যবসায়ী যদি এ কথা জানতে পারে, আমাদের নিকটতম শহরেই কিছু দিনের মধ্যে এমন একটি মেলা বসবে যার মধ্যে বেচা-কেনা করলে প্রতি টাকায় দশ টাকা লাভ হবে। এবং পুরা বৎসর কোন পরিশ্রম করার প্রয়োজন হবে না। তাহলে বলুন? কোন নির্বোধ মানুষও কি এ সূযোগ হাতছাড়া করবে? মেলার আয়োজক যদিও কৌশলগত কারণে তারিখ গোপন রাখে তার পরেও ব্যবসায়ীরা প্রাণপ্রণ চেষ্ট করবে, মেলা তারিখ জানার জন্য এবং মেলার নির্ধারিত দিনের পূর্বেই সেখানে পৌছে যাবেন।

আমলের এক মেলার সু-সংবাদ:
এখন শুনুন এক মহা সূবর্ণ সুযোগ তথা নেক আমলের এক মেলার সংবাদ মোমেনদেরকে দেওয়া হচ্ছে। কথা এতটুকু যে, মাসের নামও বলে দেওয়া হয়েছে এবং এও বলে দেওয়া হচ্ছে যে, মাসের প্রথমাংশে কিংবা দ্বিতীয়াংশে নয় বরং শুধু তৃতীয়াংশে, তবে নির্ধারিত তারিখ অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে আল্লাহ পাক দেখেন নেক আমলের আগ্রহীরা কতটুকু মেহনত ও চেষ্টা করেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দাবীদাররা কতটুকু চেষ্টা প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। এবং যে নবীজি এ রাতটির তালাসে পুরা পুরা মাস ই’তিকাফ করে কাটিয়েছেন, তাঁর ভক্ত অনুরক্তরা কয়টি রাত নিজেদের আরামকে ক্বোরবান করেন। হাদীস শরীফে قا م তথা খাঁড়া হওয়ার কথা বলা হয়েছে যার অর্থ হচ্ছে নামাজ পড়বে আর এই হুকুমের মধ্যে অন্যান্য ইবাদত যেমন কোরআন শরীফের তেলাওয়াত, যিকির ইত্যাদী অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। আর واحتسابا তথা সওয়াবের আশায় এর অর্থ লৌকিকতা কিংবা অন্য কোনো খারাপ নিয়্যতে ইবাদত বন্দেগী করবে না বরং এখলাছের সাথে একমাত্র আল্লাহ পাককে রাজি খুশি করার জন্যই ইবাদত বন্দেগী করবে। আল্লামা খাত্তাবী (রহ) বলেন, এর অর্থ হলো আল্লাহ পাক থেকে সওয়াব প্রাপ্তির আশা নিয়ে খুশী খুশী ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত হবে। ইবাদত বন্দেগীকে বোঝা মনে করবে না। আর এটা স্পষ্ট বিষয় যে যেই পরিমাণ সওয়াব প্রাপ্তির ইয়াক্বীন সেই পরিমাণ ইবাদত বন্দেগীতে কষ্ট স্বীকার করাও সহজ হবে। এই কারণেই কোনো ব্যক্তি যে পরিমাণ আল্লাহ পাকের নৈকট্য প্রাপ্ত হয়, ইবাদত বন্দেগীতে তার মনোযোগ ও সেই পরিমাণ হয়।

ফেরশতাদের আগমন:
হযরত আনাস (রাদি), রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইরশাদ বর্ণনা করেন যে, শবে কদরে হযরত জিবরাঈল (আঃ) ফেরেশতাদের এক জামাত সঙ্গে নিয়ে জমীনে অবতরণ করেন এবং ঐ সকল বান্দাদের জন্য রহমতের দু’আ করতে থাকেন যারা দাঁড়ানোর কিংবা বসা অবস্থায় আল্লাহ পাকের যিকির ও ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকে ( মিশকাত- বুখারী)।

ব্যাখা: শবে কদরে হযরত জিবরাইল (আঃ) ফেরেশতাদেরকে নিয় জমীনে আগমনের কথা কোরআন শরীফেও উল্লেখ রয়েছে। তা ছাড়া বহু হাদীস শরীফে স্পষ্ট এসেছে যে, হযরত জিবরাইল (আঃ) ফেরেশতাদেরকে বিশেষভাবে হুকুম দেন যেন, তারা প্রত্যেক মুমিন মুসলমানের ঘরে গিয়ে গিয়ে তাদের সাথে মুছাফাহা করে আসে।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদি) বলেন, ফেরেশতারা হযরত জিবরাইল (আঃ) এর হুকুম পেয়ে বিপ্তি হয়ে যায় এবং প্রত্যেক ছোট বড় ঘর, জঙ্গল কিংবা নৌকা যেখানে একজন মুসলমানও আছে। প্রত্যেকের নিকট গিয়ে মুসাফাহা করে আসেন। এখানে মুসাফাহা দ্বারা কল্যাণের দু’আও উদ্দেশ্য হতে পারে। আবার বাস্তবিক হাত মিলানোও হতে পারে। কারণ ফেরেশতারা নূরের তৈরী হন। তাই আমরা তাদেরকে দেখতেও পাই না এবং তাদের আগমনও অনুভব করতে পারি না।

যেমন, মৃত্যুপথযাত্রীর নিকট মালাকুল মউত এবং অন্যান্য ফেরেশতারা আগমন করেন, কথাবার্তা বলেন, কিন্তু সাধারণ মানুষ তা দেখেও না। অনুভবও করতে পারে না। হতে পারে আল্লাহ পাকের বিশেষ বান্দারা দেখেন এবং অনুভব করেন (রাফআত কাসেমী)।

শবে কদর গোপন রাখার রহস্য:
দামী জিনিস অর্জন করতে গেলে অন্যান্যদের তুলনায় অধিক প্ররিশ্রম করা লাগে। আর এটাই স্বভাবিক। শবে কদরের মত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত কিভাবে চেষ্টা ও মেহনত ছাড়া অর্জন হতে পারে? এ কারণেই তার নির্দিষ্ট তারিখ অস্পষ্ট বা গোপন রাখা হয়েছে। রাসুলে করিম (সাঃ) বলেছিলেন, (আছা আঁই ইয়াকুনা খায়রাল লাকুম) হতে পারে নির্ধারিত তারিখ বলে না দেওয়ার মধ্যেই তোমাদে জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে (ইবনেকাসীর)।

শবে কদরের নির্ধারিত তারিখ উল্লেখ করে দিলে এত কদর, মূল্যয়ন থাকত না। আর জানা থাকা সত্বেও শবে কদর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে হয়তো আমাদের বড় ধরণে বঞ্চিত হওয়ার লণ হয়ে যেত। আল্লামা ইবনে কাসীর দিমাস্কি (রাহ) বলেন, শবে কদরকে গোপন রাখার রহস্য এটাই যে, এর তালাশে মুসলমানরা পুরা রমাযান নিজেদেরকে আল্লাহ পাকের ইবাদত বন্দেগীতে মাশগুল রাখবে (ইবনে কাসীর)।

যদি নির্দিষ্টভাবে শবে কদর জানা হয়ে যেতো তাহলে অলস প্রকৃতির মানুষ রমাযান মাসের অন্যান্য রাতগলোর প্রতি গুরুত্বই দিত না। এখন মানুষ একাধিক রাত জাগ্রত থেকে ইবাদত বন্দেগী করবে এ আশায় যে, হয়ত আজ রাতই শবে কদর। এভাবে আগ্রহী মানুষের ইবাদত বন্দেগীর পরিমাণ অনেক বেশী বেড়ে যাবে। শবে কদর গোপান থাকার এ-ও একটি রহস্য মনে হয় যে, অনেক মানুষ এমন হয় যে, গুনাহ করা ছাড়া তাদের জীবনই চলে না। এমতাবস্থায় শবে কদর জানা থাকা সত্বেও গুনাহে লিপ্ত হলে তাদের জন্য আল্লাহ পাকের আযাবে লিপ্ত হওয়ার আর সমূহ সম্ভাবনা ছিল। একবার রাসুল করিম (সাঃ) মসজিদে তাশরীফ এনে দেখলেন এক লোক মসজিদে ঘুমিয়ে আছে। রাসুল করিম (সাঃ) এর সাথে ছিলেন হযরত আলী (রাদি)। রাসুল করিম (সাঃ) হযরত আলীকে বললেন লোকটিকে জাগিয়ে দাও এবং ওযু করে আসতে বল। আলী (রাদি) লোকটিকে জাগিয়ে দিয়ে রাসুল করিম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ আপনি তো সকল ভালো কাজে আগে আগে থাকেন। কিন্তু লোকটিকে আপনি নিজে না জাগিয়ে আমাকে জাগানোর সুযোগ দিলেন কেন? তখন রাসুল করিম (সাঃ) বললেন, যদি আমি তাকে জাগাইতাম আর অলসতার দরুন সে উঠতে না চাইত, তা হলে তা তার জন্য তির কারণ হত। কারণ, নবীর কথা অস্বীকার করার দ্বারা কুফুরী হয়ে যায়। কিন্তু তোমার কথার ইনকার করলে কুফুরী হবে না। ঠিক এমনিভাবে আল্লাহ পাকের রহমত এ কথা চায় না যে, শবে কদর জানা সত্ত্বেও কোন বান্দা নাফরমানী করার মত ধৃষ্টতা প্রদর্শন করুক। এক কারণ এ-ও মনে হয় যে, যদি শবে কদর নির্দিষ্ট থাকত। আর কোন কারণে কোন আগ্রহী মুমিন মুসলমানের রাতটিতে ইবাদত বন্দেগীর তৌফীক না হত, তা হলে তার আফসূসের অন্ত থাকত না। আর শবে কদর চলে যাওয়রার দরুন অন্য কোন রাতে জাগ্রত থেকে ইাবাদত বন্দেগী করতে তার মন সাড়া দিত না। নির্দিষ্ট না হওয়ার দরুন প্রত্যেক মুসলমানের রমাযান মাসের দু একটি রাত জাগ্রত থাকার তৌফীক হয়ে যায়।

শবে কদর গোপন থাকার ফায়দা:
শবে কদর গোপন থাকার উল্লেখ যোগ্য একটি ফায়দা এই যে, যতগুলো রাত বান্দা শবে কদরের খোঁজে জাগ্রত থাকে, আল্লাহ পাক প্রত্যেক রাতের সওয়াব বান্দাকে আলাদাভাবে দান করেন। এ ছাড়াও গোপন রাখার মধ্যে আর অনেক ফায়দা থাকতে পারে। যা আমরা জানি না। বিভিন্ন কারণে এ ধরণের অনেক বিষয়কে আল্লাহ পাক গোপন রেখেছেন। যেমন: ইসমে আযমকে আল্লাহ পাক গোপন রেখেছেন। এমনিভাবে জুমার দিন এমন একটি সময় রয়েছে যে সময়টিতে অবশ্যই আল্লাহ পাক বান্দার যে কোন দু’আকে কবুল করেন। কিন্তু সে সময়টিকে গোপন রাখা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, জুমার দিনে তোমরা সে সময়টিকে তালাশ কর। এটাও হতে পারে যে, ঐ দুই ব্যক্তির ঝগড়ার কারণে শুধু ঐ রমাযানের শবে কদরকে ভুলিয়া দেওয়া হয়েছিল। আর অন্যান্য ফায়দার কারণে চিরদিনের জন্য তা গোপন রাখা হয়েছে (ফাযায়েলে রমাযান)।

আপনি কি জানেন? হয়তো এটাই আপনার জন্য শেষ শবে কদর:
অনেক মানুষ মনে করে যে পুরা রাত জাগ্রত থাকাতো অনেক কষ্টকর। আর সামান্য সময় জাগ্রত থেকে কি লাভ? সুতরাং ঘুমিয়েই থাকি এই ধারণ সম্পূর্ণ ভূল। যদি রাতের অধিকাংশ সময় জাগ্রত থাকার তৌফিক হয়ে যায় তা হলেও ইনশাআল্লাহ এই ফযীলত অর্জন হয়ে যাবে। তাছাড়া পুরা রাতই জাগ্রত থাকা এমন কি কঠিন ব্যাপার? আমরাতো অনেক বিয়ে-শাদী ও অনুষ্টানে এমনিতেই অহেতুক কত রাত কাটিয়ে দিই। আমরা সবাই জানি যে, বিগত রমাযানে আমাদের মাঝে এমন অনেক লোক জীবিত ছিলেন, যারা আজ আমাদের মাঝে নেই। বিগত রমাযানই তাদের জীবনে শেষ রমাযান ছিল। আমাদের কে বলতে পারবে? হয়ত এই রমাযানই আমাদের জীবনের শেষ রমাযান এবং শেষ শবে কদর। আগামী রমাযান পর্যন্ত আমাদের হায়াত কুলাবে না। সুতরাং এত বড় নিয়ামত অর্জনের জন্য যদি কষ্ট করে দুই একটি রাত জাগ্রত থাকা হয় তা হলে এমন বড় বিষয় কি হবে? অগত্যা যদি পুরা রাত জাগ্রত থাকা সম্ভব না হয় অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে। তাহলে কমছে কম রাতের অধিকাংশ সময় জাগবে। আর এ জাগ্রত থাকা রাতের শেষ দিকে হলে ভাল হয়। কেননা এ সময় ইবাদত বন্দেগীতে মনোযোগ বেশী হয় আর শেষ রাত রাতের প্রথম অংশ অপো ফযীলত ও বেশী রাখে।

শবে কদরের আমল:
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাদিঃ) বলেন, আমি রাসুলে করিম (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যদি আমি ভাগ্যক্রমে শবে কদর পেয়ে যাই, তাহলে আমি আল্লাহ পাকের নিকট কি দু’আ করব? রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন হে আয়েশা! তুমি এ দু’আ পড়বে, –َالّلهُم إِنَّكَ عَفُوٌّ تٌحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ . رواه الترمذي” “হে আল্লাহ! আপনি মাকারী এবং মাকে আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি আমাকে মা করে দেন। উল্লেখিত দু’আটি অনেক পরিব্যাপ্ত। কারণ আল্লাহ পাক যদি অনুগ্রহ করে কাউকে পরকালের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে মুক্তি দেন, তাহলে বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়ার আর কি হতে পারে? এই রাতটিতে জাগ্রত থেকে নামায, তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ ও দু’আ যিকির ইত্যাদীতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। এই রাতের নির্ধারিত কোন আমল নেই। উত্তম হলো কম-বেশী প্রত্যেক আমল করা। এভাবে বিভিন্ন ধরণের আমলের সওয়াবও পাওয়া যাবে। আবার ধরণ পাল্টানোর দ্বারা ইবাদত করাও সহজ হয়ে যাবে। কখনো তিলাওয়াত, কখনো নামায, কখনো যিকির, কখনো দু’আ ও মুনাজাতে মশগুল থাকা। এই রাতে মসজিদে একত্রিত হয়ে ওয়াজ-মাহফিল ইত্যাদীর ব্যবস্থার দ্বারা যদিও সম্মিলিতভাবে রাত্রি জাগরণ সহজ হয়ে যায়। কিন্তু সবসময় এ ধরণের বিষয়ের প্রতি অত্যাধিক গুরুত্ব দেওয়া সমীচীন নয়। উলামায়ে কেরাম একে পছন্দ করেন নাই। তার প্রথম কারণ হলো, রাসুল করিম (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামের জামানায় শবে কদরে জাগ্রত থাকার এমন তরীকা ছিল না। অথচ শবে কদরের মূল্যায়ন আমাদের থেকে উনাদের নিকট অনেক বেশী ছিল। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল, শুধু সাতাইশ তারিখে এত বাড়াবাড়ির দ্বারা সাধারণ মানুষের ধারণা এই জন্ম নিবে যে, সাতাইশ তারিখেই শবে কদর। অথচ ইয়াক্বীনিভাবে সাতাইশ তারিখেই শবে কদর মনে করা সম্পূর্ণ ভূল। এর দ্বারা উল্লেখযোগ্য তি এই হয় যে, সাধারণ মানুষ অন্য কোন রাতে শবে কদর তালাশের প্রতি কোন গুরুত্বই দেয় না। অথচ শবে কদরকে গোপান রাখার রহস্যই হলো মানুষ একাধিক রাত এর তালাশে ইবাদত বন্দেগী করে কাটাবে। এছাড়াও প্রত্যেকের জানার মধ্যে যত ইবাদত রয়েছে তাহার উপর আমল করতে পার।

শবে কদরে পরিত্যার্য:
শবে কদরের রাত্রে বাজি ফাটানো, আতশ বাজি, হালোয়া রুটির আসর বসানো, নিয়মের চেয়ে অধিক বাতি জ্বালানো এবং সাজ সজ্জা করা, মাজারে বা দরগাহে দরগাহে ঘুরা, অহেতুক বসে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া, শরাব পান করা ইত্যাদীসহ যাবতীয় পাপাচার ও গোনাহের কাজ শবে কদরে পরিত্যার্য।
হতভাগা কে?
দুনিয়ার মানুষের দৃষ্টিতে সবচেয়ে নির্বোধ ও হতভাগা ঐ ব্যক্তি যে, কামাইয়ের সময়ে হাত পা গুটিয়ে অলসভাবে বসে থাকে। কামাই করার জন্য কোন চেষ্টা প্রচেষ্টা করে না। কিন্তু রাসুল করিম (সাঃ) এর দৃষ্টিতে সবচেয়ে নির্বোধ ও দূর্ভাগা ঐ ব্যক্তি যে নেক আমলের মূল্যবান সময় গুলোকে নষ্ট করে দেয়। এবং আখেরাতের জন্য কোন কিছুই কমাই করার তার তৌফীক হয় না।

হযরত আনাছ (রাদিঃ) বলেন, একবার রমাযান আসলে রাসুল করিম (সাঃ) ইরশাদ ফরমাইলেন, তোমাদের নিকট এমন একটি মাস আগমন করেছে যার মধ্যে এমন একইট রাত রয়েছে যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে এ রাত থেকে বঞ্চিত হয়ে গেল, সে যেন সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। আর এ রাতের রহমত ও বরকত থেকে ঐ ব্যক্তিই বঞ্চিত হয়, যে প্রকৃতপইে হতভাগা (ইবনে মাজা)। ঈমানের দূর্বলতা ও

নেক আমলের প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা বৈ কিছুই নয়। অন্যথায় যে কোন কারণে রাতভর জাগ্রত থাকে, এমন লোকের সংখ্যা কি দুনিয়াতে কম রয়েছে? মানুষ রাত ভর জাগ্রত থেকে নাইট ডিউটি কি করে না? সতের আঠার ঘন্টা মেশিনের মত দাড়িঁয়ে থেকেও মানুষ চাকুরী কি করে না? কিন্ত হায়! আল্লাহ পাকের জন্য কে জাগবে? মৃত্যুর আগের জীবনের জন্য সবাই প্রস্তুতি গ্রহণ করে কিন্তু মৃত্যু পরবর্তি জীবনের জন্য কে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে? যাকে অবশ্যই মরতে হবে তার জন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণ করা কি আবশ্যক নয়? মৃত্যুর আগমন অবশ্যম্ভাবী হওয়া সত্ত্বেও যে তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে না তার মাহরূম ও বঞ্চিত হওয়ার ব্যাপারে কি সন্দেহ থাকতে পারে? যে মানুষটা দুনিয়ার ষাট-সত্তর বছরের শান্তি ও আরামের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সেই মানুষটার আখেরাতের ল-কোটি বছর বরং অসীম সময়ের জীবনের সুখ-শান্তির জন্য কোনই মেহনতের প্রয়োজন নেই কি? আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে শবে কদরের প্রকৃত মর্মবাণী বুঝে তাহার উপর আমল করার তৌফিক দান করুক আমিন।

লেখক: সাংবাদিক-মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষক: আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া ভূজপুর, চট্টগ্রাম । সূত্রwww. news24.com

 

 

 

Advertisements

About kumarkhalihotnews

Kumarkhali hot News

Posted on August 15, 2012, in Uncategorized and tagged . Bookmark the permalink. 1 Comment.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: